
আসসালামু আলাইকুম
আল্লাহর অশেষ রহমতে আপনি ভালো আছেন। আমিও আপনার দোয়ায় ভালো আছি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেশের মানবিক বিপর্যয়ের একটি বিষয় নিয়ে আপনাকে লিখছি। আমি দীর্ঘ ৩৬ বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় দক্ষতার সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে কর্তব্য সম্পন্ন করেছি। দেখেছি অনেক প্রাণের রক্তেভেজা রাজপথ। সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের সারি দেখে আমি আতকে উঠি। সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমান সময়ে বহুল আলোচিত একটি বিষয়। এমন কোনো দিন নাই দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ আহত ও নিহত হয় না। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা-সমালোচনার কোনো শেষ নেই। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে তেমন কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।
সময়ে সময়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে সরকারের তরফ থেকে দ্রুত কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো স্থায়ী হয় না। আপনাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ এই জন্য যে, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারের জন্য কিছু নিয়মকানুন চালক ও মালিকদের জন্য বলেছেন, যা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই জন্য দেশের মানুষ আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে সড়ক দুর্ঘটনা কেন হয়? এই বিষয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী গবেষণামূলক বই গত ২০১৫ সালে ২১ শে বইমেলায় ইতি প্রকাশনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়।
গতি+যন্ত্র+সড়ক+আইন+ড্রাইভার+মালিক=যানবাহন।
গতি আল্লাহর সৃষ্টি। যন্ত্র বিজ্ঞানের সৃষ্টি। সড়ক বিজ্ঞানের সৃষ্টি। আইন বিজ্ঞানের সৃষ্টি। ড্রাইভার বিজ্ঞানের সৃষ্টি। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে ড্রাইভার সৃষ্টি বিজ্ঞান ভিত্তিক হচ্ছে কী?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার নিশ্চয় মনে আছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে যা কখনো আগে ঘটেনি, জাতি দুঃখের সাথে দেখলো ১১ জুলাই ২০১১ মিরশরাই বড়তাকিয়া নামক স্থানে ৬০-৭০ জন স্কুলছাত্র বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলা দেখে বাড়ি ফিরছিলো। কোমলমতি স্কুলছাত্রদের ট্রাকে গাদাগাদি করে বহন করছিলো ড্রাইভার। স্থানীয় ওয়ার্কশপ থেকে প্রস্তুত করা পাওয়ার টেইলর ইঞ্জিন দিয়ে বানানো গাড়িকে (নসিমন) সাইড দিতে গিয়েই রাস্তার পাশে পানিভর্তি খাদে পড়ে গেলে ৪৫ জন ছাত্রের মৃত্যু হয়। মায়ের বুকচেড়া শিশু-সন্তানদের এমন মৃত্যু প্রত্যাশা করা যায় কী? এরপর ২৮ জুলাই ২০১১ সালে বগুড়ার শাহজাহানপুর নামক স্থানে ট্রাক-বাস মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৯ জন তরতাজা মানুষ প্রাণ হারায়। বহু যাত্রী আহত হয়। তরতাজা মানুষগুলো ঢাকা গাবতলীর বাস টার্মিনাল থেকে রাত ১২টায় গাড়িতে ওঠে। তারা কী জানত লাশ হয়ে বাড়ি ফিরবে! ২ আগস্ট ২০১১ সালে নরসিংদীর শিবপুর নামক স্থানে দুইটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৬ জনের মৃত্যু হয়, অন্তত ৪০ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়। সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আমতলা বিসিক শিল্পনগরের সামনে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী বিসিকের শ্রমিক আলমাস জানায়, দুর্ঘটনার সময় তিনি সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন এ সময় (সোহাগ পরিবহণ বাসটি) একটি লেগুনা গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে মনোহরদী পরিবহণ (লোকাল) বাসটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। বিকট শব্দে তার কান স্তদ্ধ ও চোখ বন্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখেন রাস্তার ওপর শুধু রক্ত আর রক্ত, আহত মানুষের আহাজারি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এখানেই শেষ নয়Ñ ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট আরও একটি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা অপেক্ষা করছিলো জাতির জন্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আপনার জন্মভূমি বৃহত্তর ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার কৃতি সন্তান, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক, এটিএন বাংলা নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মনিরসহ মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরি নামক স্থানে মাইক্রোবাস ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়। মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এই স্থানে একটি মোড় ছিলো, এই সময় বৃষ্টিও হচ্ছিলো, বিপরীত দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এই দুর্ঘটনাটি ঘটার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরপর ঢাকা-আরিচা সড়কে দুর্ঘটনা প্রবল বেশ কিছু মোড় প্রশস্ত করা হয়। এ কারণে ঢাকা-আরিচা সড়ক এখন চলাচলে অনেকটাই নিরাপদ।
(২) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মনে পড়ে ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর নাটোর জেলার বনপাড়া হাটিকুমুর মহাসড়কে বড়াই গ্রাম মোড়ের আগে রেজুর মোড় নামক স্থানে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই চালকসহ ৩৫ জন্য নিহত হয়, আহত হয় ৬০ জনের মতো। একসঙ্গে এতগুলো মানুষ প্রাণ হারালো, দুই বাসচালক মুহূর্তের মধ্যেই যাত্রীদের সাথে নিজেদেরও হারিয়ে ফেলেন। প্রতিটি মুহূর্ত কত গুরুত্বপূর্ণ, মৃত্যু কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সংঘর্ষের সময় বিকট শব্দ হয়ে বাস দুটি রাস্তার দুই পাশে ছিটকে পড়ে। যাত্রীদের ক্ষত-বিক্ষত দেহগুলো রাস্তায় এলোপাতাড়ি পড়ে থাকতে দেখা যায়। আমার অভিজ্ঞতার প্রয়োজনে উপরোক্ত পাঁচটি দুর্ঘটনার স্থল আমি পরিদর্শন করি এবং দুর্ঘটনার কারণগুলো নির্ণয় করার চেষ্টা করি।
প্রথম. দুর্ঘটনাটি ঘটে মাটির সোল্ডার রাস্তার পিচ্ছিলজনিত কারণে, অর্থাৎ সোল্ডার রাস্তাটি কর্দমাক্ত ছিলো। পিচ ঢালা রাস্তায় মাটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় বৃষ্টিজনিত কারণে চাকা ও রাস্তার ঘর্ষণশক্তি হারিয়ে যায় এবং গাড়িটি মাটির সোল্ডার রাস্তা হয়ে পাশে পানিভর্তি খাদে পড়ে যায়।
দ্বিতীয়. দুর্ঘটনাটি ঘটে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সের পুরাতন গাড়ি নতুন শেপে নিউ মডেল আকৃতি দিয়ে চালানো হচ্ছিলো। এর ছয়টি টায়ারের ঘর্ষণশক্তি ছিলো না এবং চালক গাড়িটি বেপরোয়াভাবে চালিয়েছিলো এবং গাড়িটি ত্রুটিপূর্ণ ছিলো।
তৃতীয়. দুর্ঘটনাটি ঘটে ওভারটেকিং করার কারণে। এখানে চালকের যথেষ্ট অবহেলা ছিলো।
চতুর্থ. দুর্ঘটনাটি ঘটে চালকের তন্দ্রাভাব হওয়ায় অর্থাৎ মাইক্রোবাস চালক অসতর্ক ছিলো। বিপরীত দিক থেকে আসা বাসচালক গতি পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
পঞ্চম. দুর্ঘটনাটি ঘটে দ্রুতগতি ও চালকের অসতর্কতাজনিত কারণে।
ট্রাফিক আইনে বলা আছে, দ্বিমুখী দুজন গাড়িচালক নিজের মতো করে সতর্ক থাকবেন। একজন সতর্ক থাকলো অন্যজন অসতর্ক থাকলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ জন্যই প্রয়োজন চালকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ড্রাইভিং পেশাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। উন্নত বিশ্বে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন হয়। শিক্ষিত, বিচক্ষণ, সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী, বুদ্ধিমত্তা যাহার থাকে সেই ড্রাইভার হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে নিম্নোক্ত শর্তগুলো অবশ্য পালনীয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার অর্থ?
১. ট্রাফিক নিয়মাবলি মেনে চলার দায়িত্ব গ্রহণ করা। ২. নিয়মাবলি মেনে সীমিত গতিতে গাড়ি চালানো। ৩. সংকেত বাতি ব্যবহার সম্পর্কে অন্যান্য চলাচল করা গাড়ির ড্রাইভারকে জানতে দেওয়া। ৪. ওভারটেক করার কতিপয় নিয়মাবলি রয়েছে তা পালন করা। ৫. দৃষ্টি অগোচর স্থানে সীমিত গতিতে গাড়ি চালনা করা।
৬. উঁচু স্থান এবং বাকা স্থানসমূহে ওভারটেক না করা।
৭. রাত্রে গাড়ি চালানোর সময় যদি ঘুম কিংবা ক্লান্তি বোধ হয়, তবে রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করা।
৮. ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার অর্থ আর্থিক জরিমানা দেওয়া।
৯. নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে আইনগত শাস্তির চিন্তা মাথায় রাখা। ১০. ত্রুটিপূর্ণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানো শাস্তিমূলক অপরাধ মাথায় রাখা। ১১. ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি কারণ হলো দ্রুতগতিতে গাড়ি চালনা করা- এর থেকে বিরত থাকা।
১২. রাত্রে গাড়ির হেড লাইট সম্মুখ ভাগের ড্রাইভারদের চোখ ঝলসায়ে না দেওয়ার জন্য ড্রিম লাইট ব্যবহার করা।
১৩. টায়ারের ঘর্ষণ শক্তি থাকে না, এমন টায়ার দিয়ে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকা। ১৪. রাস্তা পিচ্ছিলজনিত কারণে ধীরগতিতে গাড়ি চালনা করা এবং দ্রুত ব্রেক না করা। ১৫. রাতে অথবা দিনের বেলায় বিরতিহীন গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, উপরোক্ত ১৫টি বিষয়ের ওপর আমাদের দেশের পেশাদার লাইসেন্সধারী ড্রাইভারদের প্রশ্ন করলে ৮০ ভাগ ড্রাইভার সঠিকভাবে এর উত্তর দিতে পারবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, বিআরটিএ লাইসেন্স ইস্যু করেন কীভাবে? কোন পদ্ধতিতে। প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশন থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কী? যান যেখানে যন্ত্রও সেখানে। দেশে বর্তমানে এক কোটি যন্ত্রচালিত যানবাহন (এমটি) বিদ্যমান। এখন থেকে ২০ বছর আগেও গ্রামগুলোতে মহিষ, গরু ও ঘোড়ার গাড়ির চলাচল ছিলো। তখন দুই-দশ বছরেও শোনা যায়নি ওইসব অযান্ত্রিক গাড়ির চাপায় মানুষ আহত বা নিহত হয়েছে। এই সময়ে অযান্ত্রিক গাড়ি কল্পনাও করা যায় না। থ্রি-হুইলার যান্ত্রিক যান, গ্রাম অঞ্চলের সড়কগুলোতে পিঁপড়ার সারির মতো চলাচল করে, অথচ এগুলোর কোনো ফিটনেস সার্টিফিকেট নাই। এমন কোনো দিন নেই এসব গাড়ির সাথে বাস, ট্রাক ও অন্যান্য গাড়ির সংঘর্ষে মানুষের মৃত্যু ও আহত হয় না। কেন এত অনিয়ম, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এসব দিকে নজর আছে কী?
অনিয়ন্ত্রিত গতি ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি মৃত্যু ডেকে আনে। এই ধারণাটা ড্রাইভারদের শুধু প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বুঝানো সম্ভব। মহাসড়কগুলোয় চালকরা সমপ্রতিযোগিতায় গাড়ি চালাতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়। যেমন একটি পরিবহণ কোম্পানি একশ গাড়ি পরিচালনা করেন। যথা- কোম্পানিটি ১৯৮৫ সালে ১০টি গাড়ি নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। ১৯৯০ সালে আরও ১৫টি গাড়ি যোগ হয়।
(৩) ১৯৯৫ সালে যোগ হয় ১৫টি গাড়ি। ২০০০ সালে যোগ হয় ১৫টি গাড়ি। ২০০৫ সালে যোগ হয় ১৫টি গাড়ি। ২০১০ সালে যোগ হয় ১০টি গাড়ি। ২০১৫ সালে যোগ হয় ২০টি কোম্পানির মোট গাড়ি সংখ্যা দাঁড়ায় একশটি। গাড়িগুলো দিয়ে আন্তঃজেলার দূর-দুরান্তে যাত্রীসেবা প্রদান করেন। গাড়িগুলোর মধ্যে থেকে কিছু গাড়ি মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এতে যাত্রী আহত ও নিহত হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কোম্পানির একশ’ গাড়ির মধ্যে ১০টি গাড়ির বয়স ৩২ বছর। ১৫টি গাড়ির বয়স ২৭ বছর। ১৫টি গাড়ির বয়স ২২ বছর। ১৫টি গাড়ির বয়স ১৭ বছর। ১৫টি গাড়ির বয়স ১২ বছর। ১০টি গাড়ির বয়স ৭ বছর। ১৫টি গাড়ির বয়স ২ বছর। অর্থাৎ কোম্পানির একশ’ গাড়ির বয়স ২ বছর থেকে ৩২ বছর পর্যন্ত হয়। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য ২ বছর থেকে ৩২ বছর বয়সের গাড়ির বডি স্ট্রাকচার একরকম হওয়ায় খুব কমসংখ্যক যাত্রী বুঝতে পারে গাড়িটির বয়স ৩২ অথবা ২৭ অথবা ২২ বছর হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে ৩২ ও ২৭ বছর বয়সের গাড়ি ফিটনেস সার্টিফিকেট পেতে পারে কী? যদি মহাসড়কে গাড়িগুলো চালানোর জন্য ফিটনেস ও রুট পারমিট না থাকে তাহলে কোন আইন বলে কোম্পানির মালিকরা ঝুঁকিপূর্ণ ওইসব গাড়ি চালাচ্ছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গত ঈদ-উল-ফিতরের আগে ও পরে (২০১৮) অনেকগুলো সড়ক দুর্ঘটনায় ঘরমুখী ও রাজধানীমুুখী যাত্রী ও পথচারী আহত ও নিহত হয়। তাদের মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তানদের সাথে আর ঈদ করা হলো না। গত এপ্রিল মাসটাই ছিলো রাজধানীতে দুর্ঘটনায় হাত-পা বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটি সময়। গত ৩ এপ্রিল ২০১৮ কাওরানবাজারে দুই বাসের চাপায় সরকারি তিতুমীর কলেজের মেধাবীছাত্র রাজিব হোসেনের এক হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়। গত ৫ এপ্রিল দুই বাসের প্রতিযোগিতায় দুই পায়ের শক্তি হারিয়েছে আয়েশা খাতুন নামে এক নারী। গত ১০ এপ্রিল ফার্মগেটে বাস চাপায় পা থেতলে যায় র্যাংগস প্রোপাইটিজের অভ্যর্থনাকারী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী রুনি আক্তারের। গত ১৬ এপ্রিল পলাশী মোড়ে দায়িত্ব পালনের সময়, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর দেলোয়ার হোসেনের পায়ের ওপর বাস চাপা দেয়। গত ২০ এপ্রিল গৃহকর্মী রোজিনা বান্ধবীর সাথে ঘুরতে বের হয়েছিলো। বনানীতে রাস্তা পার হতে গিয়ে বাসচাপায় রোজিনার শরীর থেকে ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শত চেষ্টার পরও রোজিনাকে বাঁচানো যায়নি। গত ২৯ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়। এপ্রিল মাসেই দেশের বিভিন্ন জেলায় আরও কিছু দুর্ঘটনায় যাত্রী ও পথচারীর হাত-পা বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আপনাকে জানানো যাচ্ছে যে, দেশের প্রতি জেলায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু নয়তো পঙ্গুত্ব বরণ করছে। পত্রিকা খুললেই এসব খবর পাওয়া যায়। এর থেকে প্রতিকার পাওয়া জরুরি। আমি জানি, শতভাগ সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। তবে ৭০ ভাগ দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। অনিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলায় গাড়ির মালিক ও চালকরা ইচ্ছার পসরা সাজিয়ে সড়ক নিয়ন্ত্রণ করছে। ইতোমধ্যে অনেক রাজনৈতিক নেতা বলেছেন, গাড়ি চালকদের গাড়ি চালাতে হলে শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না! আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী করবে ভেবে পায় না। অদক্ষ চালক ও লক্কর-ঝক্কর ফিটনেসবিহীন গাড়ির মালিকদের কারণে মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। সন্তান পিতা হারাচ্ছে, স্ত্রী স্বামী হারাচ্ছে, আত্মীয় হারাচ্ছে আপনজন, একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবক হারিয়ে অনেক সংসার হচ্ছে দেউলিয়া। বস্তুর ক্রিয়া হঠাৎ হঠাৎ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানব সমাজের জন্য কল্যাণকর। পরিবহণ বিভাগটি সম্পূর্ণ প্রযুক্তি (টেকনিকেল) বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার দক্ষ হাতে পরিচালিত সরকারের অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জনগুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয় হচ্ছে সড়ক, সেতু ও পরিবহণ মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ওয়াদুল কাদের সাহেব শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১১ সালে এই মন্ত্রণালয় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ৬টি নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিআরটিএ-এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে মন্ত্রণালয় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলো।
সিদ্ধান্তগুলো যথা
১। ১০ বছর মেয়াদি সড়ক নিরাপত্তার জন্য দেশি-বিদেশি কনসালটেন্ট নিয়োগ।
২। রোড সেফটি ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
৩। মহাসড়কের হাট-বাজারের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, প্রত্যেক জেলার ডিসি, এসপির সমন্বয়ে শক্তিশালী ট্রাস্কফোর্স কমিটি গঠন। ৪। ভুয়া লাইসেন্স ও লাইসেন্স তৈরির কারখানা ধরতে র্যাব ও ডিবি পুলিশের সহায়তা চাওয়া।
৫। পেশাদার সব ড্রাইভাদের প্রশিক্ষণ দিতে বিআরটিএ এবং বুয়েটের একসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে রিফ্রেসার কোর্স চালু করা।
(৪) প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং আইনগত নিয়ম প্রতিপালন ছাড়া বিআরটিএ কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করবে না। সড়ক নিরাপত্তা জোড়দার এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে বুয়েটের একসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট কর্তৃক চিহ্নিত সারাদেশে ২০৯টি দুর্ঘটনা প্রবণ স্থান নিরাপদ করতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তখন একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিলো। ২০১১ সালে আরও কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। যেমন পেশাদার, দক্ষ সচেতন ড্রাইভার সৃষ্টি ও দুই হাজার প্রশিক্ষক সৃষ্টির জন্য বুয়েট এবং বিআরটিএ যৌথভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ২০১১ থেকে ২০২০ দশকে রোড সেফটি দশক ঘোষণার অংশ হিসেবে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিলো। এ ছাড়া ট্রাফিক আইন নতুন করে হওয়ার কথা ছিলো।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার দৃঢ় মনোবল ও সাহসী ভূমিকার জন্য ইতোমধ্যে আপনি জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন। আশা করি, বিশৃঙ্খল গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আপনি যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। আমি দীর্ঘ ৩২ বছর সোনালী ব্যাংক লি. পরিবহণ বিভাগে ড্রাইভিং করেছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয়টি মাথায় রেখে সড়ক দুর্ঘটনা কেন হয়? আমি এই জন্য সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় কিছু প্রস্তাব ও করণীয় উপস্থাপন করছি।
১। প্রার্থীকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে ১৮-২৫ বছর বয়সের মধ্যে হতে হবে। ২। প্রার্থীকে সর্বনিম্ন এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
৩। প্রার্থীর সর্বনিম্ন উচ্চতা হতে হবে ৫ ফিট ৫ ইঞ্চি।
৪। প্রার্থীকে সুষ্ঠু ও সুঠাম দেহের অধিকারী, মারাত্মক কোনো রোগ ও মানসিক বিকারগ্রস্ত নয় এই মর্মে মেডিকেল সার্টিফিকেট থাকতে হবে।
৫। প্রার্থীকে সরকার কর্তৃক স্বীকৃত অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ থেকে গাড়ির ইঞ্জিন ও আউট ফিটিংস সম্পর্কে ৩ মাসের প্রশিক্ষণ সনদপত্র থাকতে হবে।
৬। প্রার্থীকে বিআরটিএ কর্তৃক পরিচালিত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ৩ মাসের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিতে হবে।
৭। প্রার্থীকে ট্রাফিক আইনকানুন সম্পর্কে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। ৮। প্রার্থীকে দেশের রাস্তাঘাট ভৌগলিক ও প্রকৃতির ওপরে সম্মুখ ধারণা থাকতে হবে।
৯। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে ৩৪ লাখ গাড়ির ব্লু-বুক, ট্রাক্স টোকেট, ফিটনেস সার্টিফিকেট ইস্যু ও নবায়ন, ২১ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন ও ইস্যু করা হয়। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে আরও প্রায় ১০ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি ও বিআরটিএকে আলাদা একটি মন্ত্রণালয় ঘোষণা করা।
১০। প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে (রাজধানীসহ) একটি করে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়ে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং পুরাতন ১৯টি জেলা শহরে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করার অনুরোধ জানাচ্ছি।
১১। ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইস্যু করা সব ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নকালীন সময়ে ড্রাইভারদের এক সপ্তাহের সময় উপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়া। ১২। ৮০ দশকের পুরাতন সব গাড়ি যার বয়স ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে ওইসব গাড়ির ব্লুু-বুক, ফিটনেস ও রুট পারমিট বাতিল করা।
১৩। স্থানীয় (দেশীয়) ওয়ার্কশপে প্রস্তুত করা নসিমন চার প্রকার, ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার (বিদ্যুৎচালিত) তিন প্রকার মোট সাত প্রকার গাড়ি মটর ট্রান্সপোর্ট (এমটি) প্রযুক্তিতে ত্রুটিমুক্ত প্রস্তুত করা হয়েছে কিনা বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা। উপস্থাপিত সাত প্রকার গাড়ি বিআরটিএ কর্তৃক ফিটনেস সার্টিফিকেট পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে সড়ক মহাসড়কে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। ১৪। রাজধানীসহ দেশের সব জেলায় পুরাতন ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে নয় এমন ক্ষত-বিক্ষত গাড়ি প্রয়োজনীয় মেরামত ফিটনেস সার্টিফিকেট নিয়ে চালানোর ব্যবস্থা করা।
১৫। মালবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস ড্রাইভারদের জন্য সব বিভাগীয় শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি বিশ্রামাগার করা। এতে ট্রাক ড্রাইভাররা বাধ্যতামূলক ২ ঘণ্টা বিশ্রাম নেবেন।
(ক) বিশ্রামাগারে থাকবে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। (খ) প্রয়োজনীয় জনবল ও ডাক্তার থাকবে। (গ) একটি ডিসপেনসারি থাকবে। (ঘ) একটি খাবার হোটেল থাকবে। ড্রাইভাররা স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যসামগ্রী যা অর্থের বিনিময়ে গ্রহণ করবেন। (ঙ) থাকবে একটি অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ। যাতে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির প্রয়োজনীয় মেরামত করতে পারবে। (চ) থাকবে একটি পুলিশ ক্যাম্প।
১৬। আবহাওয়া উপযোগী দীর্ঘ মেয়াদি টেকসই, মানসম্মত গাড়ি আমদানি করা হয় কিনা? তত্ত্বাবধানের জন্য সংশ্লিষ্ট (প্রযুক্তি) বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি টিম গঠন করা। ১৭। আমদানি করা বাস ও ট্রাক চেসিস দিয়ে স্থানীয় ওয়ার্কশপে তৈরি করা বডি প্রযুক্তি সম্মত ত্রুটিমুক্ত কিনা ওই সমস্ত ওয়ার্কশপ বিআরটিএ কর্তৃক নিবন্ধিত কিনা? নিবন্ধন না থাকলে যোগ্যতা অনুসারে নিবন্ধন করার ব্যবস্থা করা।
১৮। আঞ্চলিক ও মহাসড়কগুলো একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার ব্যবস্থা করা। ১৯। ড্রাইভারদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ না করার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রচার মাধ্যমগুলোকে দুর্ঘটনা কেন হয়? বিষয়গুলো বেশি বেশি প্রচার করা।
(৫) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, যানবাহনের সাথে ১০টি পক্ষ বিদ্যমান। ১০টি পক্ষের সমন্বয় ছাড়া যে যেমন পারছে, তেমন করে চলছে, চালাচ্ছে। আপনার জ্ঞাতার্থে ১০ পক্ষ উপস্থাপন করছি।
১। গাড়ি প্রস্তুতকারী ২। গাড়ি আমদানিকারী ৩। গাড়ির মালিক ৪। স্থানীয়ভাবে গাড়ির বডি প্রস্তুতকারী ৫। জ্বালানি সরবরাহকারী ৬। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী ৭। মেরামতকারী (ওয়ার্কশপ) ৮। যাত্রী সাধারণ ৯। গাড়িচালক ১০। সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ, যথা বিআরটিএ, সড়ক, সেতু ও পরিবহণ মন্ত্রণালয়, এলজিইডি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
উপরোক্ত ১০টি পক্ষের সবগুলোর সঙ্গে সমন্বয় থাকলে এবং ত্রুটিমুক্ত গাড়ি চালালে অনেকাংশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। এই ১০টি পক্ষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত গাড়িচালক পক্ষ। চালক পরিচালিত হয় মালিক দ্বারা, মালিক তাকে ব্যবহার করেন ইচ্ছামতো। গাড়ির সমস্যা, রাস্তার সমস্যা, মাস্তান সমস্যা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সমস্যা, শ্রমিক ইউনিয়ন সমস্যা। এইসব সমস্যার কোনোটিই মালিকের নাগালে আসে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে আঞ্চলিক ও মহাসড়ক মেরামত নতুন নির্মাণ প্রসঙ্গে বলতে চাই। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণ কাজ শেষ হলে আপনি ২০১৬ সালের ২ জুলাই মহাসড়কটি উদ্বোধন করেন। মাত্র ২ বছরে ফোর লেইন রাস্তাটির বেহাল দশা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ফোর লেইন রাস্তাটি এতটাই বেহাল দশা যে চালকরা খানা-খন্দ দেখলে আতকে ওঠেন। এত বেশি ছোট-বড় গর্ত যে গতি বাড়ানো সম্ভব হয় না। এ জন্য সময় লাগছে বেশি। দিন যত পার হচ্ছে গর্ত তত বড় হচ্ছে। এখন চলছে বর্ষা মৌসুম। বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা দেবে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত রাস্তাটির আসল চেহারা থাকবে কিনা সন্দেহ।
এমন কেন হলো- এর নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনবেন আশা রাখি। আঞ্চলিক ও মহাসড়ক নির্মাণ বি-নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ তদারকি করলে এমন দুর্দশা থেকে গাড়িচালক ও যাত্রী রক্ষা পাবে। কমে যাবে সড়ক দুর্ঘটনা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সঠিক নীতিমালা ও আইন অমান্য করার কারণে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। বর্তমান সময়ে গণপরিবহণে অরাজক পরিস্থিতি বিদ্যমান। প্রতিদিন সারাদেশে একশ’র ঊর্ধ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১০ জন মানুষের মৃত্যু হয়, আহত হয় অসংখ্য। প্রায় প্রতিটি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনাস্থল তদন্তে প্রশাসনের কর্মকর্তা (টেকনিকেল নয়) দিয়ে তদন্ত সম্পন্ন করা হয়।
পরিবহণ সেক্টরটি সম্পূর্ণ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল (টেকনিকেল)। যার বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা নাই তিনি অথবা তাহারা ওই দায়িত্ব পালন করতে পারেন কী? সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই লক্ষ্য করা যায় গণপরিবহণের দুরাবস্থা। বিশেষ করে, ট্রাফিক সিস্টেম দুর্বল ও নড়বড়ে।
ট্রাফিক সিস্টেম শুধু কী ট্রাফিক সিগন্যালকেই বুঝায়? (ক) সময় উপযোগী ট্রাফিক আইন সৃষ্টি করা। (খ) আধুনিক ও প্রশিক্ষিত ট্রাফিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সৃষ্টি করা। (গ) প্রকৃতি ও ভৌগলিক সম্পর্কে ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমার এ প্রয়াস বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। দেশে অনেক গাড়িচালক অনিশ্চিত যাত্রায় আত্মাহুতি দিচ্ছে। সেই সাথে প্রতিবছর ৮-১০ হাজার সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, পঙ্গু হয়ে যন্ত্রণায় কাতর দুর্বিসহ জীবনযাপন করছে। অনিয়ন্ত্রিত পরিবহণ ব্যবসার লাগাম টেনে ধরতে না পারলে রাজধানীতে গাড়ি এবং মানুষ ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকবে। কর্মহীন ঘণ্টার বিড়ম্বনায় অর্থনীতির মুখ থুবড়ে পড়বে। রাজধানীতে গণপরিবহণের জন্য যত গাড়ি এর ৪০ ভাগ মালিক সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী। এসব গাড়ির মালিক যথাযথ গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে না। এ জন্যই ক্ষত-বিক্ষত বাস, ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজি ত্রুটিপূর্ণ ফিটনেসবিহীন অবস্থায় চলাচল করে। এর থেকে উত্তোরণের একমাত্র উপায় প্রশিক্ষিত ড্রাইভার, ত্রুটিমুক্ত গাড়ি, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক সংস্কার ও ত্রুটিমুক্ত সড়ক নির্মাণ করা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি এ লেখা সাজিয়েছি সড়ক দুর্ঘটনা কেন হয়? বাস্তব অভিজ্ঞতায় আলোচনার মাধ্যমে। প্রাণঘাতী যন্ত্র যান মানুষেরই সৃষ্টি, এত অবহেলা কেন জানি না। আমার ক্ষুদ্র গবেষণালব্ধ স্বীকারোক্তি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সহায়ক হবে, আপনার সু-চিন্তিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। পত্র দীর্ঘ করে ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। আপনার দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনায়
মো. গোলাম সরোয়ার ভূইয়া
অবসরপ্রাপ্ত ড্রাইভার, সোনালী ব্যাংক লি.
উপজেলা: বালিয়াকান্দি, জেলা: রাজবাড়ী।
